Header Ads

Header ADS

লস্ট ইন স্পেস: মহাকাশে হারিয়ে যাওয়ার এক রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা

২০৪৬ সাল। পৃথিবী আর মানুষের জন্য নিরাপদ নেই। আকাশ থেকে অনবরত ঝরে পড়ছে উল্কাপিণ্ড, বাতাস হয়ে উঠছে বিষাক্ত। মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিজ্ঞানীদের সামনে একটাই রাস্তা—নতুন কোনো বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বের করা। আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রব্যবস্থা আলফা সেন্টউরিতে পাওয়া গেল এমনই এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান। বাছাই করা কিছু যোগ্য পরিবারকে নিয়ে রেজোলিউট নামে এক বিশাল নভোযানে শুরু হলো মহাকাশের এক নতুন যাত্রা।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু যাত্রাপথে হঠাৎ ঘটে গেল এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ভিনগ্রহী এক এলিয়েনের আক্রমণে রেজোলিউট ভেঙে পড়ার উপক্রম। প্রাণ বাঁচাতে রবিনসন পরিবার তাদের ছোট স্পেসশিপ জুপিটার-২ নিয়ে আলাদা হয়ে গেল। অন্য অনেকে অবলম্বন করল একই পন্থা। ছিটকে পড়ল সম্পূর্ণ অচেনা এক গ্রহে। পৃথিবীতে ফেরার কোনো উপায় নেই। চারপাশের পরিবেশ একদম অচেনা, পদে পদে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর ফাঁদ। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর টিকে থাকার গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে সায়েন্স ফিকশন সিরিজ লস্ট ইন স্পেস

লস্ট ইন স্পেস সিরিজের দৃশ্য

এই সিরিজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর ভেতরের বিজ্ঞান। সায়েন্স ফিকশন মানেই যে শুধু লেজার, বন্দুক ও স্পেসশিপের মারামারি নয়, বরং পদে পদে মেধা ও বিজ্ঞানের সূত্র ব্যবহার করে কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বেঁচে ফেরা যায়, তার এক দারুণ উদাহরণ এই সিরিজ।

অচেনা ওই গ্রহের বরফ জমাট বাঁধা হ্রদে স্পেসশিপ ডুবে যাওয়া থেকে শুরু করে, বায়ুমণ্ডলের হঠাৎ পরিবর্তন, বিষাক্ত মিথেন গ্যাস, হিমবাহের ধস কিংবা অচেনা ভিনগ্রহী প্রাণীদের আক্রমণ—প্রতিটি বিপদ থেকে বাঁচতে রবিনসন পরিবারকে বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হতে হয়। মা মরিন রবিনসন একজন দুর্ধর্ষ অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার। স্পেসশিপের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে নতুন জ্বালানি তৈরি করতে হয়, কিংবা বায়ুচাপ কাজে লাগিয়ে মহাকাশে পাড়ি দেওয়া যায়, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তেই থাকে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের নিঁখুত ব্যবহার।

আলফা সেন্টাউরি আমাদের থেকে প্রায় ৪.৩৭ আলোকবর্ষ দূরে। বর্তমান প্রযুক্তিতে সেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। সিরিজে দেখানো হয়েছে, মানুষের তৈরি মহাকাশযানে ভিনগ্রহী প্রযুক্তির ইঞ্জিন যুক্ত করে স্থান-কাল বাঁকিয়ে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

লস্ট ইন স্পেস সিরিজের দৃশ্য

এ ছাড়া সিরিজের গ্রহগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনো গ্রহে হয়তো দিনের বেলায় ভয়াবহ গরম, আবার রাতে তাপমাত্রা নেমে যায় হিমাঙ্কের নিচে। কোনো গ্রহে হয়তো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর চেয়ে আলাদা। একটি বাসযোগ্য গ্রহে কী কী ধরনের বায়ুমণ্ডলীয় ও ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য থাকতে পারে, তার এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কল্পনা এই সিরিজে দেখা যায়।

সিরিজের সবচেয়ে আইকনিক চরিত্র পরিবারের সবচেয়ে ছোট ছেলে উইল রবিনসন এবং একটি ভিনগ্রহী রোবট। অচেনা গ্রহে উইল ঘটনাক্রমে একটি ভিনগ্রহী রোবটের প্রাণ বাঁচায়। এরপর থেকে রোবটটি উইলের সবচেয়ে বড় রক্ষক হয়ে ওঠে। বিপদের আভাস পেলেই রোবটটির সেই বিখ্যাত ডায়লগ, ‘ডেঞ্জার, উইল রবিনসন!’ এটি এই সিরিজের একটি ট্রেডমার্ক।

লস্ট ইন স্পেস সিরিজের পোস্টার

একনজরে

সিরিজের নাম: লস্ট ইন স্পেস

নির্মাতা: আরউইন অ্যালেন, ম্যাট সাজামা, বার্ক শার্পলেস

ধরন: সায়েন্স ফিকশন, অ্যাডভেঞ্চার, ফ্যামিলি ড্রামা, এলিয়েন

প্রকাশকাল: ২০১৮ – ২০২১

সিজন: ৩টি

ব্যাপ্তি: মোট ২৮টি এপিসোড (প্রতিটি এপিসোড প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট)

আইএমডিবি রেটিং: ৭.৩/১০

এই রোবট এবং মানুষের মধ্যকার আবেগ ও যোগাযোগের বিষয়টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক দারুণ দিক তুলে ধরে। ভিনগ্রহী প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে, তা এই জুটির মাধ্যমে খুব সুন্দর করে দেখানো হয়েছে।

এটি শুধু মহাকাশের গল্প নয়, এটি একটি পারিবারিক বন্ধনেরও গল্প। বাবা জন রবিনসন একজন নেভি সিল, বড় মেয়ে জুডি একজন চিকিৎসক এবং মেজো মেয়ে পেনি দারুণ সাহসী। সবাই মিলে কীভাবে বিপদের মুখে একে অপরের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, সেটাই সিরিজের মূল ভিত্তি।

লস্ট ইন স্পেস সিরিজটি শুধু মহাকাশের গল্প নয়, এটি একটি পারিবারিক বন্ধনেরও গল্প

তবে মহাকাশের প্রাকৃতিক বিপদের চেয়েও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায় ড. স্মিথ নামের এক চরিত্র। সে কোনো এলিয়েন বা দৈত্য নয়, একদম সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু তার ধূর্ততা, মিথ্যা বলা এবং মনস্তাত্ত্বিক চালগুলো গল্পে দারুণ উত্তেজনা তৈরি করে। টিকে থাকার জন্য একজন মানুষ কতটা স্বার্থপর হতে পারে, সে তার নিখুঁত উদাহরণ। এ ছাড়া ডন ওয়েস্ট নামে একজন মেকানিকের চরিত্র গল্পে দারুণ হিউমারের জোগান দেয়।

সিরিজটির ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট একদম আন্তর্জাতিক মানের। অচেনা গ্রহের ল্যান্ডস্কেপ, মহাকাশের দৃশ্য, ব্ল্যাকহোল, বিশাল বিশাল স্পেসশিপ এবং রোবটগুলোর ডিজাইন আপনাকে  মুগ্ধ করবে। প্রতিটি ফ্রেম এত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে যে মনে হবে, আপনি সত্যিই ওই অচেনা গ্রহের কোনো এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছেন।

১৯৬০-এর দশকের একটি পুরোনো ক্লাসিক সিরিজের রিমেক হলেও, বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় তৈরি করা হয়েছে। তিন সিজনের (২০১৮-২০২১) এই সিরিজটির গল্প ইতিমধ্যে সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। তাই কোনো অসমাপ্ত ক্লাইম্যাক্সের জন্য আপনাকে হতাশ হতে হবে না।

লস্ট ইন স্পেস সিরিজের দৃশ্য

যারা মহাকাশের বিশালতা, এলিয়েন প্রযুক্তি, বিজ্ঞানের রোমাঞ্চ এবং সারভাইভাল স্টোরি ভালোবাসেন, তাদের জন্য লস্ট ইন স্পেস একটি মাস্টারপিস। তাই সময় পেলে রবিনসন পরিবারের সঙ্গে এই মহাকাশযাত্রায় আপনিও যুক্ত হতে পারেন!



No comments

Powered by Blogger.