Header Ads

Header ADS

পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট তৈরি হচ্ছে: সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের মজুত ও কালোবাজারি করছে। এর ফলে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট তৈরি হচ্ছে।

জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে আজ রোববার বিকেলে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।

সাধারণত সংসদ সদস্যরা ১৫ দিন সময় দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন (নোটিশ দেন)। সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কথা জানায় গতকাল শনিবার রাতে। যে কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে লিখিত প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর তারকাচিহ্নিত ও লিখিত প্রশ্নের জবাব আগেই প্রস্তুত করে রাখা হয়। ফলে মন্ত্রীর বক্তব্যেও মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি আসেনি।

অন্যদিকে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, মন্ত্রীর লিখিত জবাব প্রত্যেক সংসদ সদস্যের টেবিলে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন না করে মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে মৌখিকভাবে প্রশ্নের জবাব দিলে সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পেতেন সংসদ সদস্যরা। সে ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রীকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হতো।

অবশ্য আজ দুপুরে সচিবালয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে দেশেও সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

‘প্যানিক বায়িং’

এরপর বিকেলে সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে (টেবিলে উত্থাপিত) জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে মোটরবাইকে ২০০ টাকার ফুয়েল (জ্বালানি তেল) দেওয়ার কোনো নির্দেশনা দেয়নি। তবে ‘প্যানিক বায়িং’ (আতঙ্কের কেনাকাটা) ও মজুতপ্রবণতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।

মজুত ও কালোবাজারি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত আছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৫১০টি মামলা হয়েছে। ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদণ্ড আদায়ের পাশাপাশি ৫ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

২০-২৩ শতাংশ আমদানি হয় হরমুজ হয়ে

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, কুয়েত, মালয়েশিয়া, চীন, আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ওমান ও ভারত থেকে সরাসরি চুক্তির আওতায় বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) ৫০ শতাংশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। বাকি ৫০ শতাংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আমদানি করা হয়।

মন্ত্রী বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের জন্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত জ্বালানি তেল) আমদানি করা হয়। বছরে ১৩ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় আমদানি করা ক্রুড অয়েলের শতভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করা হয়। তবে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না। সামগ্রিকভাবে মোট আমদানি করা জ্বালানি তেলের ২০ থেকে ২৩ শতাংশ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে পরিবহন করা হয়।

ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশে এলপিজির বাজারের প্রায় ৯৮ দশমিক ৬৭ ভাগ আমদানিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনির পরিকল্পনা

ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদের এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তর ও দক্ষিণাংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা), নওগাঁ ও জয়পুরহাটজুড়ে বিস্তৃত জামালগঞ্জ কয়লাখনির উত্তর-পশ্চিমাংশের ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং রংপুরের খালাসপীর কয়লাখনির ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুরের দিঘীপাড়া কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের জন্য ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৩’ হালনাগাদ করার লক্ষ্যে খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। এই খসড়ার ওপর ভেটিং (আইনি যাচাই) হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো লোডশেডিং নেই। তবে উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতি, কৃষিসেচ ও গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝেমধ্যে কিছুটা বিদ্যুৎ–বিভ্রাট ঘটে থাকে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা

ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিলের পরিমাণ ৫২ হাজার ৩০০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের আরেক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে কুইক রেন্টাল (দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র) প্রকল্পের নামে লুটপাট ও বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’–এর কথা উল্লেখ করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, এই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ (বিদ্যুতের দাম) অনুমোদন করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় প্রায়ই বিদ্যুতের অন্যায্য মূল্য এবং অস্বাভাবিক ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হতো। বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজনেরাও ছিলেন।

সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিতর্কিত ওই বিশেষ বিধান আইন রহিত করে অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশ ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হয়েছে। এর ফলে আগের মতো স্বেচ্ছাচারী প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

মন্ত্রী আরও জানান, লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

সংকট না থাকলে এত লম্বা লাইন কেন

জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সংসদে বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে, যদি জ্বালানির কোনো সংকটই না থাকে, তাহলে এত লম্বা লাইনই-বা কেন? দামই-বা বাড়াইতে হয় কেন? অফিস কর্মসূচির সময় পরিবর্তন করতে হয় কেন? এই প্রশ্নগুলো তো ওঠে!’

আজ জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের আলোচনায় রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল যে কাদম্বিনী মরে নাই। আমাদের তেলের দাম শেষমেশ বৃদ্ধিই হইল। কিন্তু তার আগে আমরা দেখলাম কয়েক কিলোমিটারজুড়ে লম্বা লাইন। মাঝরাত পর্যন্ত ড্রাইভাররা দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা তেল পাচ্ছেন না। কিন্তু সরকারের সে ব্যাপারে কোনো হেলদোল নেই।’

স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য বলেন, মন্ত্রীরা যখন সংসদে বক্তব্য দেন, তখন তাঁরা অবলীলায় বলেন দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু যখন তেল নিতে যায়, তখন দেখা যায় তিন কিলোমিটার লম্বা লাইন।

রুমিন ফারহানা বক্তব্য দেওয়ার সময় সরকারি দলের কোনো কোনো সংসদ সদস্যকে হাত নেড়ে কিছু বলতে দেখা যায়। রুমিনের বক্তব্যের পর সরকারি দলের সদস্যরা হইচই করতে থাকেন। তখন স্পিকার সংসদ সদস্যদের সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।

পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে কিছু সদস্য এমন কিছু অঙ্গভঙ্গি করেছেন, যেটা তাঁর বিবেকে আঘাত লেগেছে। তিনি এর নিন্দা জানান।



No comments

Powered by Blogger.