রাষ্ট্রভাষা প্রশ্ন: বিকল্প রাজনৈতিক পরিসর হিসেবে আদালত
বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় এখনো পর্যন্ত আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থা উপেক্ষিত রয়ে গেছে। বিচারব্যবস্থার ইতিহাস রচনার কোনো উল্লেখযোগ্য প্রয়াস দেখা যায়নি। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও আইন-আদালতসংক্রান্ত উপাদান বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ভাষা আন্দোলন ও পাকিস্তান আমলের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৯০ সালে বিআইডিএসের পাঁচ খণ্ডের গবেষণা প্রকল্পে (ভাষা আন্দোলনের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, ইউপিএল, ১৯৯০) ভাষা আন্দোলনের সময়ের বিচারব্যবস্থার পর্যালোচনা হাজির করা হয়নি। অথচ আমরা জানি, আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন-শোষণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্রের সর্বত্র জড়িয়ে থাকা বিস্তৃত আইনি কাঠামো। আমি এর আগে একটি লেখায় (ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন বিচারকাঠামো, প্রথম আলো, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) আদালতের রিপোর্টেড রায়সহ কিছু আইনি উপাদান ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করেছিলাম, পাকিস্তানের কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রকাঠামোতে আইন ও আদালত কীভাবে নাগরিক অধিকার রক্ষার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছিল। আজকের এ লেখায় আমি ১৯৬৭ সালের ঢাকা হাইকোর্টের একটি রিপোর্টেড রায় বিশ্লেষণ করে দেখব, আইন-আদালত কীভাবে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ক্ষমতাসীনদের অবস্থানের প্রতিধ্বনি করেছিল এবং জনক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছিল; স্বাধীন বাংলাদেশেও অপরিবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় কীভাবে একই আইনের কাঠামোর বরাত দিয়ে এই অচলায়তন অক্ষুণ্ন রয়েছে।
১.
আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলা প্রথম আনুষ্ঠানিক (ছদ্ম) স্বীকৃতি লাভ করে ১৮৩৭ সালে। সে বছর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি আইন নং ২৯) মাধ্যমে ফার্সির পরিবর্তে ওড়িয়া, বাংলা ও হিন্দুস্তানি (উর্দু) ভাষাকে আদালতের ভাষা করা হয়। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল কাউন্সিলের সদস্য টি সি রবার্টসনের ১৮৩৯ সালের একটি বক্তৃতা থেকে বোঝা যায়, ওই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল ‘স্থানীয় ভাষাগুলোকে দিয়ে ফার্সিকে বরখাস্ত করার কাজ সম্পন্ন করার পর পর্যায়ক্রমে সেগুলোকে হটিয়ে ইংরেজি প্রতিষ্ঠা করা।’ এ প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল তার একটা বিবরণীও পাওয়া যায় ১৯৫৯ সালে বাংলার প্রথম ল্যাফটেনেন্ট গভর্নর (১৮৫৪-৫৯) এফ জে হ্যালিডের সিলেক্ট কমিটিতে দেওয়া বক্তৃতায়। তিনি বলেন, স্থানীয় আদালত থেকে আরজি-জবাব ইত্যাদি রেকর্ড বাংলা ও ওড়িয়া ভাষায় আসতে থাকে। তা ছাড়া, একটি রুল জারি করে ব্যারিস্টার ও ইংরেজি-জানা স্থানীয় উকিলদের জন্য আদালতের কার্যক্রমে ইংরেজির ব্যবহার অনুমোদন করা হয়। আইনশিক্ষার মাধ্যম হিসেবেও ইংরেজি ভাষাকে অত্যাবশ্যকী করা হয়। ভারতীয়দের মধ্যে বিলেত গিয়ে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি নিয়ে আসাও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ইংরেজি–জানা স্থানীয় উকিলদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজিই আদালতের ভাষা হিসেবে প্রতিস্থাপিত হয়, স্থানীয় ভাষা হয়ে পড়ে ব্যতিক্রম।
১৮৩৭ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি আইন নং ২৯–এর মাধ্যমে ফারসির পরিবর্তে ওডিশি, বাংলা ও হিন্দুস্তানি (উর্দু) ভাষাকে আদালতের ভাষা করা হয়। আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল ‘স্থানীয় ভাষাগুলোকে দিয়ে ফার্সিকে বরখাস্ত করার কাজ সম্পন্ন করার পর পর্যায়ক্রমে সেগুলোকে হটিয়ে ইংরেজি প্রতিষ্ঠা করা।’
এই দ্বৈতনীতি পুরো ঔপনিবেশিক আমলজুড়ে চলে: উচ্চ আদালতে ইংরেজি, অধস্তন আদালতে কমবেশি বাংলা। কিন্তু ১৯২০-এর দশক থেকে রাজনীতি ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিতর্কে ‘জাতীয় ভাষা’ গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হিসেবে হাজির হয়। পাকিস্তানপর্বে তা প্রত্যক্ষ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা শুরু হয়, ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে ভাষার প্রশ্ন স্বাধিকার আন্দোলনের আঁতুড়ঘর হিসেবে আবির্ভূত হয় ।
১৯৫৪ সালের ২১ দফার প্রথম দফায় বলা হয়: ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে।’ ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের ২১৪ অনুচ্ছেদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়। কিন্তু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে পরবর্তী ২০ বছরের জন্য ইংরেজি অফিস-আদালতের ভাষা হিসেবে বহাল থাকবে এবং সংসদ চাইলে এর পরেও রাষ্ট্রীয় কাজে ইংরেজির ব্যবহার অব্যাহত রেখে আইন করতে পারবে; দশ বছর পর প্রেসিডেন্ট ইংরেজি প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করার জন্য একটি কমিশন গঠন করবেন। প্রাদেশিক সরকার চাইলে ইংরেজির পরিবর্তে উর্দু বা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে কোনো বাধা থাকবে না।
কিন্তু এই নীতি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হয়। ১৯৬২ সালে প্রণীত আইয়ুব খানের ‘স্বৈরতান্ত্রিক সংবিধানে’ (২১৫ অনুচ্ছেদ) বাংলার পরিধি আরও সংকুচিত করা হয়। এবার বাংলা ও উর্দুকে বলা হয় ‘জাতীয় ভাষা’, সঙ্গে বলা হয় ১০ বছর পর দাপ্তরিক কাজে ইংরেজির বদলে অন্য ভাষা চালু করা যায় কি না তা বিবেচনার জন্য প্রেসিডেন্ট একটি কমিশন গঠন করবেন। ইংরেজিকে আবারও রক্ষাকবচ দেওয়া হয়; বলা হয়: ‘কিন্তু এই অনুচ্ছেদকে অন্য ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বিশেষত ইংরেজি ভাষা দাপ্তরিক ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে, যত দিন পর্যন্ত এর প্রতিস্থাপনের কোনো ব্যবস্থা গৃহীত না হয়।’
পুরো ষাটের দশকে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা-নিয়ন্ত্রণ, সভা-সমিতি ও সংবাদপত্র দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনসহ বিরোধী মতের ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার কারণে রাজনৈতিক পরিসর ছিল খুব সংকুচিত। সে সময় বিকল্প রাজনৈতিক পরিসর হিসেবে হাজির হয় আদালত।
আইয়ুব খান নতুন সংবিধানের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। পুরো ষাটের দশকে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা-নিয়ন্ত্রণ, সভা-সমিতি ও সংবাদপত্র দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনসহ বিরোধী মতের ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার কারণে রাজনৈতিক পরিসর ছিল খুব সংকুচিত। সে সময় বিকল্প রাজনৈতিক পরিসর হিসেবে হাজির হয় আদালত।
কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় আইন-আদালতকে রাষ্ট্রের দমনমূলক চেহারায় প্রলেপ লাগিয়ে ক্ষমতার বৈধতাকরণসহ বিচিত্র উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় ব্যাপক জনরোষকে বিকল্প পথে পরিচালিত করে বৃহত্তর আন্দোলনকে খণ্ডীকরণ করার জন্য আদালতকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়া সব সময় শাসকগোষ্ঠীর জন্য অবিমিশ্র আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করেনি; বরং আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত নাগরিক অধিকার এবং ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রতিকারের সম্ভাবনা সীমিত হলেও সামরিক-বেসামরিক কর্তৃত্ববাদের কালে আদালত অনেক সময় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি বিকল্প পরিসর হিসেবে হিসেবে উন্মোচিত হয়, নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিসরে রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার সংকীর্ণ কিন্তু সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ রকম একটি বিকল্প রাজনৈতিক লড়াইয়ের জমিন হিসেবে আবির্ভূত হয় ১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট বা ঢাকা হাইকোর্ট। ১৯ ডিএলআর ১৯৬৭ ৪৮৩-এ প্রকাশিত শামছ্উদ্দিন আহমদ বনাম রেজিস্ট্রার, ঢাকা হাইকোর্ট মামলার রায়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক ভাষানীতি ও বৈষম্যমূলক বিচারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন আইনজীবী শামছ্উদ্দিন আহমদ।
২.
শামছ্উদ্দিন আহমদ আইন পরীক্ষা পাস করে ১৯৬৩ সালে ঢাকা জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। গাজীউল হকের উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন (জোনাকী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৪) বইয়ের বরাতে আমরা জানতে পারি, ছয় দফার আন্দোলন চলাকালে ১৯৬৬ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য শামছ্উদ্দিন আহমদ বাংলায় একটি আবেদনপত্র বার কাউন্সিলের কাছে দাখিল করেন। হাইকোর্টে বাংলা ভাষা অচল—এই অজুহাত দেখিয়ে বার কাউন্সিল সম্পাদক তাঁকে সনদ মঞ্জুর করতে অস্বীকৃতি জানান। সামছ্উদ্দিন কড়া ভাষায় প্রতিবাদপত্র লিখে বলেন, সম্পাদকের কোনো অধিকার নেই বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করার এবং তাঁকে শামছ্উদ্দিনকে দরখাস্ত লিখতে বাধ্য করার। শেষ পর্যন্ত বার কাউন্সিলের সভাপতি এ বি এম হুসেনের (পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান বিচারপতি) মধ্যস্থতায় তাঁকে সনদ দেওয়া হয়।
শামছ্উদ্দিন আহমদ ১৯৬৬ সালের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে বাংলায় লেখা একটি ক্রিমিনাল রিভিশন পিটিশন দাখিল করেন। হাইকোর্টের অ্যাফিডেভিট কমিশনার আদালতের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া বাংলা পিটিশনের অ্যাফিডেভিট করতে অস্বীকৃতি জানান। শামছ্উদ্দিন বিষয়টি হাইকোর্টের একজন বিচারকের আদালতে মেনশন দেন। বিচারক তাঁকে এ বিষয়ে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে যেতে বলেন। পিটিশনার শামছ্উদ্দিন রেজিস্ট্রারের কাছে বাংলাতেই লেখা একটি অভিযোগ দাখিল করে বলেন, অ্যাফিডেভিট কমিশনার বাংলায় লিখিত হলফনামার সত্যতা যাচাই করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যা আইনসংগত নয়। হাইকোর্টের সব পিটিশন ইংরেজিতে দাখিল করতে হবে মর্মে ১৯৫৬ সালে প্রণীত হাইকোর্ট রুলসের বিধান ১৯৬২ সালের সংবিধানের ২১৫ অনুচ্ছেদের বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সে কারণে তা বাতিল ও কার্যকারিতাশূন্য। রেজিস্ট্রার কোনো কারণ না দেখিয়ে পিটিশনটি ফেরত পাঠান। শামছ্উদ্দিন রেজিস্ট্রারের এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৬৭ সালের ২৫ এপ্রিল সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এস এম মুর্শেদ ও আবদুল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চে রিট পিটিশন দায়ের করেন। হাইকোর্ট (বিস্তারিত শুনানি না করে) সংক্ষিপ্তভাবে তা খারিজ করেন দেন এই যুক্তি দেখিয়ে, যেহেতু এখনো পর্যন্ত বাংলাকে আদালতের ভাষা করা হয়নি, সেহেতু বাংলায় লেখা পিটিশন হাইকোর্টে পেশ করা যাবে না। ফলে, রেজিস্ট্রার সঠিকভাবেই উক্ত রিভিশন আবেদন ফেরত পাঠিয়েছেন।
নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিসরে রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার সংকীর্ণ কিন্তু সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ রকম একটি বিকল্প রাজনৈতিক লড়াইয়ের জমিন হিসেবে আবির্ভূত হয় ১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট বা ঢাকা হাইকোর্ট।
কিন্তু শামছ্উদ্দিন দমবার পাত্র নন; তিনি হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আবার পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ টু আপিল আবেদন করেন। প্রধান বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, বিচারপতি এস এ রহমান, বিচারপতি ফজলে আকবর, বিচারপতি হামুদুর রহমান ও বিচারপতি ইয়াকুব আলীকে নিয়ে বেঞ্চ গঠিত হয়। এই কোর্টেও তিনি বাংলায় আবেদন দাখিল করেন। তাঁর জোরাজুরির ফলে প্রধান বিচারপতির আদেশে এই পিটিশন ও এর সংযুক্তিগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় অ্যাটর্নি জেনারেল গিয়াস মুহাম্মদ, পশ্চিম পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজা সাইদ আকবর, পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল টি এইচ খানসহ সুপ্রিম কোর্টের বাঘা বাঘা আইনজীবীদের সামনে আবেদনকারী শামছ্উদ্দিন স্বপক্ষে এই মামলায় শুনানি করেন। ১৯৬৭ সালের ১২ জুন ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট অধিবেশনে ফুল বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। শামছ্উদ্দিন বাংলায় বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বাঙালি বিচারকেরা বাংলায় কথা বললেও তাঁকে ইংরেজিতে বক্তব্য দেওয়ার জন্য জোর করতে থাকেন। তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। আদালত রূঢ় ভাষায় চাপ দিতে থাকেন। কারণ, তিনজন বিচারপতি অবাঙালি এবং আদালতের ভাষায় ‘বাংলার সঙ্গে পরিচিত নন’। শামছ্উদ্দিন তখন বলেন, পাকিস্তানের প্রধান ভাষা না বুঝলে তাঁদের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়াই ভালো। কোনো কোনো বিচারপতি চটে যান, পূর্ণাঙ্গ শুনানি ছাড়াই দরখাস্ত খারিজ করা হয়। তবে আদেশ তাঁকে বাংলাতেই শুনানো হয়। ক্ষমতাসীন এলিটদের আস্থাভাজন বাঙালি বিচারক হামুদুর রহমান রায় লেখেন। তিনি ঢাকা হাইকোর্টের বিচারক থাকাকালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে পরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হন।
উচ্চ আদালতের রায়ে আমরা সাধারণত দেখি, উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্কের উল্লেখ করে পরে বিচারকেরা নিজেদের বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত হাজির করেন। কিন্তু শামছ্উদ্দিনের মামলায় সরকারপক্ষে বাঘা বাঘা আইনজীবী থাকলেও তাঁদের যুক্তিতর্কের কোনো উল্লেখ রায়ে দেখা যায় না। সরকারপক্ষের উকিলদের বক্তব্য বিচারকদের বক্তব্যের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। ফলে এই রায় পাঠ করলে দেখা যাবে এখানে শাসক ও শাসিতের চিরন্তন বিবাদ-বিসম্বাদের নাটকীয় মঞ্চায়ন। আমরা কল্পনা করতে পারি, আদালত হয়ে উঠেছিল স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রত পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী তথা মাতৃভাষায় বিচারলাভের অধিকারবঞ্চিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি শামছ্উদ্দিন আহমদ বনাম পাঁচ বিচারক, ততোধিক সরকারি উকিল তথা পুরো পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক-কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে তর্কবিতর্ক ও বাক্যুদ্ধের ক্ষেত্র।
রায়ে শামছ্উদ্দিনকে তীব্রভাবে ভর্ৎসনা করা হয়। বলা হয়, শামছ্উদ্দিন স্বীকার করেছেন যে তিনি ইংরেজি ভাষায় ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হয়েছেন। এর পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব পরীক্ষায় তিনি ইংরেজিতে ‘কোনো মতো’ পাস করেছেন। আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি তাঁর সব পেশাগত কাজ বাংলা ভাষায় করে আসছিলেন; জেলা আদালতেও বাংলায় কার্যক্রম (প্লিড/সওয়াল-জবাব) পরিচালনা করেছেন এবং ‘তিনি ইংরেজি প্রায় ভুলতে বসেছেন’।
হাইকোর্টে বাংলা ভাষা অচল এই অজুহাতে বার কাউন্সিল সম্পাদক তাঁকে সনদ মঞ্জুর করতে অস্বীকৃতি জানান। শামছ্উদ্দিন কড়া ভাষায় প্রতিবাদপত্র লিখে বলেন, সম্পাদকের কোনো অধিকার নেই বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করার এবং তাঁকে ইংরেজিতে দরখাস্ত লিখতে বাধ্য করার।
আদালত অভিযোগ করেন, শামছ্উদ্দিন ভালোভাবেই জানতেন যে এই বেঞ্চের কমপক্ষে তিনজন বিচারক ‘বাংলার সঙ্গে পরিচিত নন’, তারপরও তিনি বাংলায় দরখাস্ত দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে’ প্রধান বিচারপতির আদেশে এই পিটিশন ও এর সংযুক্তিগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করার পরেও তিনি ক্ষান্ত হননি। ইংরেজি বুঝতে ও বলতে পুরোপুরি সক্ষম হলেও তিনি বাংলায় শুনানি করার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। ‘সত্যি সত্যি অসুবিধা বোধ করলে’ অন্য কোনো আইনজীবীর সাহায্য নিতে বলা হলেও তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানান। ‘আদালতের সাধারণ বিধিবিধানেরও কোনো তোয়াক্কা না করে তিনি জোরাজুরি করেন যে তাঁর বাংলায় কথা বলার অধিকার আছে, কারণ তা জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।’
তারপর শামছ্উদ্দিনের যুক্তিগুলো নাকচ করা হয় প্রধানত আইনের খুবই আক্ষরিক, টেকনিক্যাল ও পজিটিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। শামছ্উদ্দিন প্রধানত তিনটি যুক্তি উপস্থাপন করেন। প্রথমত তিনি দাবি করেন, হাইকোর্টে আরজি/দরখাস্ত ও অন্য কার্যাবলি ইংরেজিতে হতে হবে এবং বাংলায় পেশকৃত কাগজপত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে হবে মর্মে হাইকোর্ট রুলসের সংশ্লিষ্ট বিধান সংবিধানের ২১৫ অনুচ্ছেদের বিধানাবলির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ফলে তা বাতিল ও কার্যকারিতাশূন্য। আদালত উত্তরে বলেন, উক্ত অনুচ্ছেদের প্রাথমিক পাঠ থেকেই এটা পরিষ্কার যে দাপ্তরিক ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে ইংরেজি ভাষার ব্যবহারকে সংবিধান নিষিদ্ধ বা বারিত করে না, যত দিন পর্যন্ত ইংরেজি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা না হয়।’
দ্বিতীয় যুক্তি হিসেবে শামছ্উদ্দিন বলেন, ২১৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা ও উর্দু’ অংশটুকু অনুচ্ছেদের মৌলিক (substantive) অংশ; বাকি অংশটুকু এসেছে ব্যতিক্রম আকারে, যা মৌলিক অংশের কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ করতে পারে না। আদালত থেকে বলা হয়, এই যুক্তি পরিষ্কারভাবেই অগ্রহণযোগ্য ও ত্রুটিপূর্ণ। কারণ, এখানে ব্যতিক্রম বিধানের পরিষ্কার উদ্দেশ্য উল্লিখিত সময় পর্যন্ত মৌলিক বিধানের কার্যকারিতা স্থগিত করা। অন্যথা এই ব্যতিক্রম বিধান অর্থহীন ও নিরর্থক। আদালত এখানে আইন ব্যাখ্যার সর্বজনীন নীতির দ্বারস্থ হন যে আইনের কোনো শব্দ পুনরাবৃত্তিমূলক বা প্রয়োজনাতিরিক্ত নয়। সাধারণভাবে কোনো আইনের কোনো বিধানকে ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষভাবে তার সম্পূর্ণতা নিয়ে পড়তে গেলে তার প্রতিটি শব্দ বিবেচনায় নিতে হবে, অর্থ দিয়ে পড়তে হবে। শামছ্উদ্দিনের ব্যাখ্যা গ্রহণ করার অর্থ পুরো অনুচ্ছেদটার মৌল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার নামান্তর, যেখানে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ পর্যন্ত দাপ্তরিক কাজ পরিচালনায় ইংরেজির ব্যবহার সুস্পষ্টভাবে অনুমোদন করা হয়েছে।
সর্বশেষ ও সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী যুক্তি হিসেবে শামছ্উদ্দিন বলেন, হাইকোর্ট কর্তৃক বাংলায় পিটিশন গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানো মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। এ প্রসঙ্গে তিনি সংবিধানের ২ অনুচ্ছেদ উল্লেখ (রেফার) করেন, যেখানে বলা হয়েছে, ‘আইন অনুযায়ী এবং কেবলই আইন অনুযায়ী’ ব্যবহার পাওয়া নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। বাংলায়/জাতীয় ভাষায় আদালতে দরখাস্ত দাখিল করতে না দিয়ে তাঁকে তাঁর এই ‘অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আইনের উদার ব্যাখ্যার মাধ্যমে নাগরিক অধিকারের পরিসর বিস্তৃত করার সুযোগ ছিল, গণতান্ত্রিক সমাজে আদালতের অনুমিত ভূমিকাও তা-ই হওয়া উচিত।
কিন্তু বিচারক এই বিস্তৃত জুরিসপ্রুডেন্সিয়াল তর্কে যেতে রাজি হননি, বরং সহজ টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে তাঁকে উড়িয়ে দেন। বিচারক বলেন, ‘…তিনি ইংরেজি ভাষায় যথেষ্ট দক্ষ। কারণ, এমনকি জেলা আদালতের আদেশ ও রায় আমরা যত দূর জানি এখনো পর্যন্ত ইংরেজিতে লেখা হয়। জেলা আদালতে প্র্যাকটিস করার জন্যও ইংরেজিতে ভালো দক্ষতার প্রয়োজন হয়।…তাঁর প্র্যাকটিস করার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়নি। হাইকোর্টস রুল মেনে তিনি তাঁর অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। কারণ, সংবিধানের ৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সমানভাবে আইন মেনে চলা তাঁর মৌলিক দায়িত্বের অংশ।’
বিচারক আরও বলেন, ‘…ইংরেজিতে হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করা তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য হবে—এ কথা ছাড়া তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি তাঁর কোন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। আমরাও এমন কোনো সুনির্দিষ্ট মৌলিক অধিকার আবিষ্কার করতে সক্ষম হইনি, যা এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে চিহ্নিত করা যায়।’
হাইকোর্ট রুলস অন্যান্য আইনের মতো সমান কার্যকারিতাসম্পন্ন আইন এবং সংবিধানের অধীনে প্রণীত। ফলে আবেদনকারীর সঙ্গে আইনানুগ আচরণই করা হয়েছে, অন্যথা নয়। ফলে, আবেদনের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি (গ্রাউন্ড) নেই, কাজেই তা খারিজ। অর্থাৎ কোনো আইন প্রণীত হলেই সার, তা যতই জনবিরোধী ও অধিকার সংকোচনকারী হোক, তা জনগণের ওপর প্রয়োগ করা যাবে।
আদালত রূঢ় ভাষায় চাপ দিতে থাকেন। কারণ, তিনজন বিচারপতি অবাঙালি এবং আদালতের ভাষায় ‘বাংলার সঙ্গে পরিচিত নন’। শামছ্উদ্দিন তখন বলেন, পাকিস্তানের প্রধান ভাষা না বুঝলে তাদের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়াই ভালো। কোনো কোনো বিচারপতি চটে যান, পূর্ণাঙ্গ শুনানি ছাড়াই দরখাস্ত খারিজ করা হয়।
এই রায় প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালের ১২ জুন। শামছ্উদ্দিন আহমদ ৩ জুলাই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের ঢাকা কার্যালয়ে ১২৫ টাকা কোর্ট ফি প্রদান করে একটি রিভিউ পটিশন দাখিল করেন। এবারও তিনি বাংলায় মুসাবিদা করেন। সুপ্রিম কোর্টের ঢাকাস্থ সহকারী রেজিস্ট্রার তা ফেরত পাঠালে তিনি তা ডাকযোগে লাহোর পাঠিয়ে দেন। লাহোরস্থ ডেপুটি রেজিস্ট্রার তাঁকে লিখে পাঠান, রিভিউ পিটিশনটি ইংরেজি ভাষা দাখিল করতে হবে। উত্তরে শামছ্উদ্দিন বলেন, ১৯৪৭ সালের পর এ দেশের জনগণ ইংরেজিতে লিখতে বাধ্য নন। বিচারপতি কর্নেলিয়াস তখন আদেশ দেন, দরখাস্ত ফেরত দেওয়া হোক। তবু তিনি যদি বাংলায় দরখাস্ত করতে চান, তবে তা নিজ খরচে ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে দাখিল করতে হবে। শামছ্উদ্দিন ১৯ টাকা খরচ করে অনুবাদ করিয়ে তা ঢাকায় দাখিল করেন। দরখাস্তটি শুনানির জন্য গৃহীত হয়। কিন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে শুনানি বন্ধ থাকে। ১৯৬৮ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি আরেকটি পিটিশন করে, সেটিও গৃহীত হয়।
ঔপনিবেশিক শাসন থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাকিস্তান যে বিচারব্যবস্থা পেয়েছে, তার প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হলো বিচারকেরা এখানে লিগ্যাল পজিটিভিজম দ্বারা গভীরভাবে আক্রান্ত। অর্থাৎ আইনের প্রত্যক্ষ বিধানের বাইরে নাগরিক অধিকার, সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ তাঁদের বিবেচ্য নয়। কোনো স্বৈরশাসক ক্ষমতা দখল করে সংবিধান বাতিল করে দিলে তা-ও সই, মৌলিক অধিকার স্থগিত করলে তা-ও সই, কারণ নতুন প্রবর্তিত আইনে সে রকমই বলা থাকে।
এই সুপ্রিম কোর্টই পাকিস্তানের প্রথম দশকের সকল রাজনৈতিক বিপর্যয়ে ক্ষমতাসীনদের প্রধান বৈধতা উৎপাদনকারী অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের আদালতও একই ঐতিহ্যে লালিত, এখানেও ঔপনিবেশিক কাঠামোকে সমুজ্জ্বল উত্তরাধিকার হিসেবে উদ্যাপন করা হয়। সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা এবং ১৯৮৭ সালে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণয়ন করা হলেও ১৯৯১ সালের হাশমতউল্লা বনাম আজমিরী বিবি মামলায় (৪৪ ডিএলআর ১৯৯২ ৩৩২) আমরা দেখি, আদালতের ভাষার প্রশ্নে উচ্চ আদালত সেই আগের অবস্থানই গ্রহণ করেন। তিন দশক পেরিয়ে নানা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দেখা গেলেও এখনো আমাদের আইন-আদালতে ইংরেজি ভাষার আধিপত্যই ক্রিয়াশীল।
No comments